যুদ্ধের খরচে নাজেহাল ইসরায়েল, বিপর্যস্ত অর্থনীতি
- আপডেট সময় : ০৪:২৪:২৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ জুন ২০২৫
- / 48
অনলাইন ডেস্ক:
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার পারদ চড়তে থাকা ইসরায়েল ও ইরান টানা সপ্তম দিনের মতো একে অপরের ওপর হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনা—কোনো কিছুই বাদ যাচ্ছে না এই পাল্টাপাল্টি হামলায়। এতে প্রাণহানির পাশাপাশি উভয় দেশের অর্থনীতি তীব্র চাপে পড়ছে, যা দীর্ঘস্থায়ী হলে বড় মন্দার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গত শুক্রবার ইসরায়েলের হামলায় ইরানের কয়েকজন উচ্চপর্যায়ের সামরিক কর্মকর্তা ও পরমাণু বিজ্ঞানী নিহত হন। এ ছাড়া তেল ও গ্যাসক্ষেত্রসহ জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরানও ইসরায়েলের সরকারি স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ নগর এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
ইসরায়েলের জন্য এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপ নজিরবিহীন। দেশটির অর্থনৈতিক দৈনিক কালকালিস্ট জানিয়েছে, গাজায় চলমান সামরিক অভিযানে ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ ইসরায়েলের ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ২৫০ বিলিয়ন শেকেল বা ৬৭.৫ বিলিয়ন ডলার। ইরানের সঙ্গে চলমান নতুন সংঘর্ষের মাত্র দুই দিনেই খরচ হয়েছে ৫.৫ বিলিয়ন শেকেল (প্রায় ১.৪৫ বিলিয়ন ডলার)। এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই নতুন যুদ্ধের ব্যয় গাজা যুদ্ধের ব্যয়কেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাজেট ২০২৩ সালে যেখানে ছিল ৬০ বিলিয়ন শেকেল (১৭ বিলিয়ন ডলার), ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৯ বিলিয়ন শেকেল (২৮ বিলিয়ন ডলার)। ২০২৫ সালে এই বাজেট ১১৮ বিলিয়ন শেকেল (৩৪ বিলিয়ন ডলার) ছাড়াতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। যুদ্ধের ব্যয় বাড়তে থাকলে জিডিপির ৪.৯ শতাংশ বাজেট ঘাটতির লক্ষ্যমাত্রা ধরে রাখা কঠিন হয়ে যাবে বলে শঙ্কা অর্থ মন্ত্রণালয়ের।
অন্যদিকে, ইরানের অর্থনীতি যুদ্ধের ধাক্কায় আরও টালমাটাল। ইসরায়েলি হামলায় দক্ষিণ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে আংশিক উৎপাদন বন্ধ রয়েছে, যা থেকে ইরানের ৮০ শতাংশ গ্যাস আসে। পাশাপাশি খারগ দ্বীপ থেকে তেল রপ্তানি একদম স্থবির হয়ে গেছে। বিশ্লেষক সংস্থা Kpler জানিয়েছে, আগামী রবিবার পর্যন্ত ইরানের তেল ও কনডেনসেট রপ্তানি দৈনিক ১ লাখ ২ হাজার ব্যারেলে নেমে যাবে, যেখানে এ বছরের গড় ছিল ২ লাখ ৪২ হাজার ব্যারেল।
২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের পর থেকেই ইরানের বৈদেশিক আয়ের প্রধান উৎস তেল রপ্তানি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। ২০১৬ সালে যেখানে রপ্তানি ছিল ২.৮ মিলিয়ন ব্যারেল, তা ২০২২-২৩ সালে কমে দাঁড়ায় মাত্র ২ লাখ ব্যারেলে।
ইরানের অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর করছে বিদ্যুৎ ও পানির ঘাটতি, দুর্বল অবকাঠামো, রিয়াল মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও উচ্চ বেকারত্ব। সরকারি হিসাব অনুযায়ী মুদ্রাস্ফীতি ৪০ শতাংশ বলা হলেও বাস্তবে তা ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন। দারিদ্র্যের হার ২২ থেকে ২৭ শতাংশের মধ্যে। সরকারি হিসাবে বেকারত্ব ৯.২ শতাংশ হলেও প্রকৃত হার আরও বেশি বলে ধারণা করা হয়।
প্রতিরক্ষা খাতে ইরান বাজেটের ৩-৫ শতাংশ ব্যয় করে, যা প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার। বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ আছে ৩৩ বিলিয়ন ডলার। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য এই রিজার্ভ পর্যাপ্ত নয়। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান নিজেই স্বীকার করেছেন, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এখন ইরান-ইরাক যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির চেয়েও খারাপ।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—চলমান যুদ্ধ কতদিন দুই দেশের অর্থনীতি বহন করতে পারবে, আর এই অস্থিরতা কতদূর ছড়াবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে?















