স্বর্গভূমি কাশ্মির কেন পরিণত হলো রণক্ষেত্রে?
- আপডেট সময় : ০৯:১৭:৪৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৭ মে ২০২৫
- / 124
মনোযোগ প্রকাশ ডেস্ক:
কাশ্মির-প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে মোড়ানো এক উপত্যকা, যাকে অনেকেই ‘পৃথিবীর স্বর্গ’ বলে অভিহিত করেন। কিন্তু এই স্বর্গীয় ভূমিই আজ বিশ্বের অন্যতম সামরিকায়িত ও অস্থিতিশীল অঞ্চল। দক্ষিণ এশিয়ার দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশ-ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দশকের পর দশক ধরে চলমান উত্তেজনা, সংঘর্ষ ও যুদ্ধের কেন্দ্রে অবস্থান করছে কাশ্মির। সেই সঙ্গে চীনের ভূরাজনৈতিক আগ্রাসন কাশ্মির সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিভক্তির বীজ: ১৯৪৭ ও পরবর্তী সঙ্কট
১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত বিভক্ত হয়ে স্বাধীনতা লাভের পর জন্ম নেয় দুটি রাষ্ট্র-ভারত ও পাকিস্তান। তবে কাশ্মির রাজ্যের ভাগ্য নির্ধারণ সে সময় অমীমাংসিত রয়ে যায়। রাজ্যটির তৎকালীন হিন্দু মহারাজা হরি সিং চেয়েছিলেন স্বাধীনভাবে অবস্থান বজায় রাখতে। কিন্তু পাকিস্তান-সমর্থিত উপজাতীয় বিদ্রোহীরা কাশ্মিরে আক্রমণ চালালে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। আত্মরক্ষার জন্য তিনি ভারতের সহায়তা চান এবং ‘ইন্সট্রুমেন্ট অব অ্যাকসেশন’-এর মাধ্যমে ভারতভুক্ত হন। এর ফলে শুরু হয় ভারত-পাকিস্তান প্রথম যুদ্ধ। ভারত দখলে রাখে জম্মু, কাশ্মির ভ্যালি ও লাদাখ অঞ্চলের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ; অন্যদিকে পাকিস্তান অধিকার করে আজাদ কাশ্মির ও গিলগিত-বালতিস্তান।
পরবর্তী যুদ্ধ ও চীনের আগমন
কাশ্মির ইস্যুতে ১৯৬৫ সালে ফের বড় সংঘর্ষে জড়ায় ভারত ও পাকিস্তান। যুদ্ধবিরতি আনতে হস্তক্ষেপ করে জাতিসংঘ। ১৯৭২ সালের শিমলা চুক্তিতে উভয় দেশ ‘লাইন অব কন্ট্রোল’ (LoC) মেনে নিতে রাজি হয়। তবুও উত্তেজনা প্রশমিত হয় না। এদিকে ১৯৬২ সালে পূর্ব কাশ্মিরের আকসাই চিন এলাকা দখল করে নেয় চীন, যা আজও তাদের দখলে। এই অংশটি নিয়ে ভারত-চীনের মধ্যে রয়েছে স্থায়ী বিরোধ।
সশস্ত্র বিদ্রোহ ও নিরাপত্তাহীনতার ইতিহাস
১৯৮০’র দশক থেকে কাশ্মিরে ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ ঘনীভূত হতে থাকে। গড়ে ওঠে বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী। জবাবে ভারত মোতায়েন করে লক্ষাধিক সেনা। মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম, হত্যা ও ধরপাকড়ের অভিযোগে উত্তপ্ত হতে থাকে উপত্যকা। একের পর এক হামলা ও পাল্টা জবাবে রক্তাক্ত হতে থাকে কাশ্মির।
২০১৬ সালে উরিতে সন্ত্রাসী হামলায় ১৯ ভারতীয় সেনা নিহত হলে ভারত ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ চালায় পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত অংশে। ২০১৯ সালে পুলওয়ামা আত্মঘাতী হামলায় ৪০ ভারতীয় জওয়ান নিহত হলে ভারত প্রত্যাঘাত করে বালাকোটে বিমান হামলা চালিয়ে।
রাজনৈতিক মোড় ও বর্তমান পরিস্থিতি
২০১৯ সালের ৫ আগস্ট ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করে জম্মু ও কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার করে। এর ফলে রাজ্যটিকে ভাগ করে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করা হয়, জম্মু ও কাশ্মির এবং লাদাখ। মোদি সরকারের দাবি, এই পদক্ষেপের পর কাশ্মিরে স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে এবং পর্যটন খাতে উন্নতি হয়েছে।
তবে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখনো উপত্যকাজুড়ে রয়েছে সেনা ক্যাম্প, চেকপোস্ট, ইন্টারনেট বন্ধের মতো নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ। গুপ্তহত্যা, নিরাপত্তাবাহিনী ও বেসামরিক নাগরিকদের প্রাণহানি ঘটছে নিয়মিত। সর্বশেষ উদাহরণ, ২০২৫ সালের মে মাসে পেহেলগামে পর্যটকদের ওপর হামলা, যা কাশ্মির পরিস্থিতির ভঙ্গুরতাকে আবারও সামনে এনেছে।
ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও ভবিষ্যতের আশঙ্কা
কাশ্মির বর্তমানে তিনটি রাষ্ট্র-ভারত, পাকিস্তান ও চীনের ভূ-রাজনৈতিক আগ্রহের কেন্দ্রস্থলে। অঞ্চলটি শুধু ধর্মীয় ও জাতিগত নয়, কৌশলগত কারণেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত-পাকিস্তান পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ হওয়ায় যেকোনো উত্তেজনা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও উদ্বেগ তৈরি করে।
এখনও পর্যন্ত কাশ্মির সংকটের কোনো রাজনৈতিক সমাধান আসেনি। প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতিহিংসাপরায়ণ মনোভাব, কূটনৈতিক স্থবিরতা এবং জনগণের প্রকৃত আকাঙ্ক্ষার প্রতি উপেক্ষা এই দ্বন্দ্বকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে। ফলে ‘পৃথিবীর স্বর্গ’ থেকে ‘যুদ্ধক্ষেত্র’ হয়ে ওঠা কাশ্মির যেন এক মর্মন্তুদ বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।















