মিয়ানমারে বিধ্বংসী ভূমিকম্প: নিহত হাজার ছাড়াল, নিখোঁজ বহু
- আপডেট সময় : ০৬:৪৫:৫৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৯ মার্চ ২০২৫
- / 120
মিয়ানমারে শক্তিশালী ভূমিকম্পে প্রাণহানির সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। দেশটির সামরিক সরকারের বরাতে বিবিসি জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ১,০০২ জনে পৌঁছেছে। আহত হয়েছেন অন্তত ২,৩৭৬ জন, আর নিখোঁজ রয়েছেন ৩০ জন।
শুক্রবার (২৯ মার্চ) স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্পটি মিয়ানমার কাঁপিয়ে তোলে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) জানিয়েছে, এর উৎপত্তিস্থল ছিল দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের শহর সাগাইং থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে, যা রাজধানী নেপিদো থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার উত্তরে। ভূমিকম্পের ভয়াবহতা এতটাই ছিল যে, বাংলাদেশ, চীন, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামেও কম্পন অনুভূত হয়।
ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মিয়ানমারের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালয় ও রাজধানী নেপিদো। মান্দালয় ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থলের সবচেয়ে নিকটবর্তী শহর হওয়ায় সেখানে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে। নেপিদোতে এখন পর্যন্ত ৯৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, মান্দালয়ে নিহত হয়েছেন ৩০ জন।
সাগাইং অঞ্চলে প্রাণহানির সংখ্যা ১৮ জন বলে জানিয়েছে জান্তা সরকার। বিশেষ করে জুমার নামাজের সময় দুটি মসজিদ ধসে পড়ায় অন্তত ৩৪ জন নিহত হন।
ভূমিকম্পের প্রভাব পড়ে প্রতিবেশী থাইল্যান্ডেও। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ব্যাংককে একটি নির্মাণাধীন ভবন ধসে পড়লে ৯০ জন শ্রমিক নিখোঁজ হন, ছয়জন মারা গেছেন এবং ২২ জন আহত হয়েছেন। প্রায় এক হাজার কিলোমিটার দূরের ব্যাংককেও শক্তিশালী কম্পন অনুভূত হয়েছে, যেখানে আতঙ্কে লোকজন রাস্তায় নেমে আসে, মেট্রো ও যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
ভূমিকম্পের ভয়াবহতার পর মিয়ানমারের সামরিক সরকার আন্তর্জাতিক সহায়তার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন জানিয়েছে। দেশটির সামরিক শাসক মিন অং হ্লাইং বলেন, “মিয়ানমারের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সাহায্য করতে চাওয়া যে কোনো দেশ ও সংস্থার কাছ থেকে সহায়তা গ্রহণ করতে আমরা প্রস্তুত।”
এটি সামরিক জান্তা সরকারের জন্য একটি বিরল ঘোষণা, কারণ সামরিক শাসনের কারণে আন্তর্জাতিকভাবে প্রায় বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে দেশটি। সেনা মুখপাত্র জাও মিন তুন বলেন, “আমরা চাই, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যত দ্রুত সম্ভব মানবিক সহায়তা দিক।”
ভূমিকম্পের পর জাতিসংঘ তাদের আঞ্চলিক সহায়তা কার্যক্রম সক্রিয় করেছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, “আমরা সম্পূর্ণ সহায়তা দিতে প্রস্তুত।” বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) দুবাই থেকে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসা সরঞ্জাম পাঠিয়েছে।
ভারত, ফ্রান্স ও ইউরোপীয় ইউনিয়নও ত্রাণ কার্যক্রম চালানোর পরিকল্পনা করছে। ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যাঁ-নোয়েল বারো বলেছেন, “আমরা সহায়তা পাঠাতে প্রস্তুত।” তবে উদ্ধার তৎপরতা ব্যাহত হচ্ছে ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রবেশের সীমাবদ্ধতার কারণে।
ভূমিকম্পের কারণে মিয়ানমারের বিভিন্ন স্থানে ভূপৃষ্ঠে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। বহু সড়ক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। মান্দালয়ের উদ্ধারকারী দলের একজন সদস্য বিবিসিকে বলেন, “আমরা শুধু এটুকু বলতে পারি, মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেশি। এটি কয়েকশ হতে পারে।”
মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকার জানিয়েছে, দেশটির ছয়টি অঞ্চল—সাগাইং, মান্দালয়, ম্যাগওয়ে, বাগো, ইস্টার্ন শান রাজ্য ও নেপিদোতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে।
এদিকে, চীনের সীমান্তবর্তী ইউনান ও সিচুয়ান প্রদেশেও ভূকম্পনের আঘাতে ভবন ধসে কয়েকজন আহত হয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত দুই দশকের মধ্যে এটি মিয়ানমারের সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প। দেশটি বৈশ্বিক ভূকম্পন ঝুঁকির ‘রেড জোনে’ অবস্থিত, বিশেষ করে সাগাইং ফল্ট লাইনের ওপর। ১৯৩০ ও ১৯৫৬ সালে এই ফল্ট লাইনে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। ২০১৬ সালে ৬.৮ মাত্রার ভূমিকম্পে মিয়ানমারে তিনজন নিহত হন।
বর্তমানে মিয়ানমারের বিভিন্ন শহরে উদ্ধার অভিযান চলছে, তবে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।















