বাংলাদেশ ০১:৪৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬, ২৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
ইসলামপুরে এ এস এম আব্দুল হালিমের সমর্থনে মহিলাদলের উঠান বৈঠক অনুষ্ঠিত হাইকোর্টের রায় স্থগিত, ডাকসু নির্বাচনে আর কোনো বাধা নেই সর্বশক্তি দিয়ে সুন্দর নির্বাচন আয়োজনের অঙ্গীকার সিইসির ভারতে পালিয়ে থেকেও বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় চালু করলেন আ.লীগ নেতা হানিফ যশোরের শার্শায় জামায়াত ছাড়লেন ৯ কর্মী, বিএনপিতে যোগদান শেরপুর ও সাতক্ষীরায় বিএনপির ৭৩ নেতাকর্মীর জামায়াতে যোগদান হলুদ সাংবাদিকতার পতন আমার হাত ধরেই হবে: ডাকসু প্রার্থী সর্ব মিত্র চাকমা সৌদিতে তিন সন্তানকে বাথটাবে চুবিয়ে হত্যা করলেন ভারতীয় মা চবি শিক্ষার্থীদের ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দেওয়া বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা উদয় কুসুম বড়ুয়া বহিষ্কার রাজাকারি কোনো স্লোগান এই দেশে শুনতে চাই না: ফজলুর রহমান

আওয়ামী লীগ নেতাদের রক্ষায় সক্রিয় জামায়াত নেতা আনিছ

  • আপডেট সময় : ০৩:১০:১৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ জুলাই ২০২৫
  • / 70

কুড়িগ্রামের রাজিবপুর উপজেলার এক প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে “জাউনিয়ার চর বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়” নামে ভুয়া একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে অন্তত ২১টি পরিবারকে নিঃস্ব করেছেন স্থানীয় জামায়াত নেতা আনিছুর রহমান ও তার ভাজতী জামাই মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুল। ‘চাকরি’ দেওয়ার প্রলোভনে তারা প্রায় ১ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, রাজিবপুর থানায় জামায়াতের একটি মামলায় উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল হোসেন ও উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক বায়েজিদ ইসলাম বিজয়কে বাঁচাতে তাদের পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করার।

ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের সুযোগ নিয়ে আনিছ ও বাবুল মিলে ওই স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর ২০১৭ সালে তারা গ্রামে গ্রামে ঘুরে ভালো বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নিতে শুরু করেন। কেউ গরু বিক্রি করে, কেউ ধার করে আবার কেউ স্বর্ণালংকার বিক্রি করে তাদের হাতে টাকা তুলে দেন।

মোহনগঞ্জ ইউনিয়নের বাসিন্দা বেহুলা-মোস্তফা দম্পতি জানান, “আমাদের মেয়েটি মেধাবী ছিল। আনিছুর রহমান একাধিকবার বাসায় এসে চাকরির প্রস্তাব দেন। পরে আমরা গরু বিক্রি ও ঋণ করে টাকা দিই। এখন ৮ বছর হয়ে গেলেও চাকরির খবর নেই। বরং টাকা ফেরত চাইলে হুমকি দেয়।”

রাজিবপুর সদর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য ফরিজল হক বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “আমার হাত দিয়েই আনিছকে দেড় লাখ ও পরে আরও ৫০ হাজার, মোট ২ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। এখনও চাকরির কোনো খবর নেই।”

অন্যদিকে, ভুক্তভোগী নারী হাসনা হেনার কাছ থেকেও মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুল মোটা অঙ্কের টাকা নিয়েছেন। তিনি একটি ডায়েরিতে বাবুলের স্বাক্ষরসহ লেনদেনের বিবরণ সংরক্ষণ করেছেন। তদন্তে প্রমাণ উপস্থাপন করলে বাবুল শুরুতে স্বীকার করলেও পরে দাবী করেন, “এটা আমার সাক্ষর না।” এরপর আবার বলেন, “আমি ১ লাখ টাকা ফেরত দিয়েছি।”

হাসনা হেনা আরও জানান, “চাকরি দেওয়ার নামে তারা প্রায় ১ কোটি টাকা নিয়েছে। আনিছ একবার চাকরির প্রক্সি দিতে গিয়ে ধরা পড়ে জেলে গিয়েছিল। পরে আমাদের টাকায় বাবুল তাকে জামিনে ছাড়িয়ে আনে। আগে আনিছ একটা পুরনো মোটরসাইকেল চালাত, এখন তার তিন লাখ টাকার বাইক আছে। বাবুল গড়ে তুলেছেন গরুর খামার, রড-সিমেন্টের ব্যবসা, স্ত্রীর চাকরি ও নিজের বেতনও এখান থেকে হচ্ছে।”

স্থানীয়রা জানান, সর্বশেষ ২০২০ সালে বিদ্যালয়টি খোলা ছিল। এরপর সেটি বন্ধ হয়ে যায়। এখন সেখানে খড়খুটো ফেলে রাখা হয়।

বিদ্যালয়ের জমিদাতা আবুল কাশেম বলেন, “আমি জমি দান করেছিলাম সমাজসেবার উদ্দেশ্যে। কিন্তু তারা প্রতারণা করেছে। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”

স্কুলটির অনুমোদন প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে। একটি সূত্র জানায়, রাজিবপুর উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আজিম উদ্দিনকে স্কুলের সভাপতি বানিয়ে অনুমোদন আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছিল। গণমাধ্যমে আজিম উদ্দিন স্বীকার করেন, “আমি একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে সভাপতি হই। আমি সুপারিশ করেছিলাম। আনিছ একসময় আওয়ামী লীগ করতেন, পরে জামায়াতে যোগ দেন। সাবেক প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেনের সময় রাজিবপুরে যত রান্নাঘরের প্রকল্প হয়েছিল, সবগুলো কাজ আনিছ পেয়েছিল। টিআর, কাবিখা সবই তার হাত দিয়ে গেছে।”

এছাড়া জামায়াত নেতা আনিছ রাজনীতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে আরও একাধিকবার আলোচনায় আসেন। অভিযোগ রয়েছে, রাজিবপুর থানায় জামায়াতের একটি মামলায় উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল হোসেন ও উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক বায়েজিদ ইসলাম বিজয়কে বাঁচাতে তাদের পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন।

আবুল হোসেন বলেন, “আনিছ আমাকে বলে—সবই তো বোঝো, টাকা ছাড়া কিছু হয় না। দুই লাখ খরচ করো, আমি বলে দিচ্ছি—তাহলে ওরা বাড়িতেই থাকতে পারবে।” তবে আনিছ তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং দাবি করেন, “আমি শুধু পরামর্শ দিয়েছি থানায় গিয়ে ১-২ লাখ টাকা দিয়ে নাম কেটে নিতে।”

বিষয়টি নিয়ে জামায়াত কুড়িগ্রাম জেলা আমির মাওলানা আব্দুল মতিন ফারুকী বলেন, “এটি আমাদের দলের নীতির পরিপন্থী কাজ। কেউ যদি এমন কাজ করে থাকেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিকভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এদিকে স্থানীয় জুলাই যোদ্ধারা ও সাধারণ মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যাদের হাতে আমাদের ভাই শহীদ হয়েছেন, সেই জামায়াত নেতা এখন আওয়ামী লীগের নেতাদের বাঁচানোর নামে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে—এটা মেনে নেওয়া যায় না।”

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

আওয়ামী লীগ নেতাদের রক্ষায় সক্রিয় জামায়াত নেতা আনিছ

আপডেট সময় : ০৩:১০:১৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ জুলাই ২০২৫

কুড়িগ্রামের রাজিবপুর উপজেলার এক প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে “জাউনিয়ার চর বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়” নামে ভুয়া একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে অন্তত ২১টি পরিবারকে নিঃস্ব করেছেন স্থানীয় জামায়াত নেতা আনিছুর রহমান ও তার ভাজতী জামাই মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুল। ‘চাকরি’ দেওয়ার প্রলোভনে তারা প্রায় ১ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, রাজিবপুর থানায় জামায়াতের একটি মামলায় উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল হোসেন ও উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক বায়েজিদ ইসলাম বিজয়কে বাঁচাতে তাদের পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করার।

ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের সুযোগ নিয়ে আনিছ ও বাবুল মিলে ওই স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর ২০১৭ সালে তারা গ্রামে গ্রামে ঘুরে ভালো বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নিতে শুরু করেন। কেউ গরু বিক্রি করে, কেউ ধার করে আবার কেউ স্বর্ণালংকার বিক্রি করে তাদের হাতে টাকা তুলে দেন।

মোহনগঞ্জ ইউনিয়নের বাসিন্দা বেহুলা-মোস্তফা দম্পতি জানান, “আমাদের মেয়েটি মেধাবী ছিল। আনিছুর রহমান একাধিকবার বাসায় এসে চাকরির প্রস্তাব দেন। পরে আমরা গরু বিক্রি ও ঋণ করে টাকা দিই। এখন ৮ বছর হয়ে গেলেও চাকরির খবর নেই। বরং টাকা ফেরত চাইলে হুমকি দেয়।”

রাজিবপুর সদর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য ফরিজল হক বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “আমার হাত দিয়েই আনিছকে দেড় লাখ ও পরে আরও ৫০ হাজার, মোট ২ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। এখনও চাকরির কোনো খবর নেই।”

অন্যদিকে, ভুক্তভোগী নারী হাসনা হেনার কাছ থেকেও মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুল মোটা অঙ্কের টাকা নিয়েছেন। তিনি একটি ডায়েরিতে বাবুলের স্বাক্ষরসহ লেনদেনের বিবরণ সংরক্ষণ করেছেন। তদন্তে প্রমাণ উপস্থাপন করলে বাবুল শুরুতে স্বীকার করলেও পরে দাবী করেন, “এটা আমার সাক্ষর না।” এরপর আবার বলেন, “আমি ১ লাখ টাকা ফেরত দিয়েছি।”

হাসনা হেনা আরও জানান, “চাকরি দেওয়ার নামে তারা প্রায় ১ কোটি টাকা নিয়েছে। আনিছ একবার চাকরির প্রক্সি দিতে গিয়ে ধরা পড়ে জেলে গিয়েছিল। পরে আমাদের টাকায় বাবুল তাকে জামিনে ছাড়িয়ে আনে। আগে আনিছ একটা পুরনো মোটরসাইকেল চালাত, এখন তার তিন লাখ টাকার বাইক আছে। বাবুল গড়ে তুলেছেন গরুর খামার, রড-সিমেন্টের ব্যবসা, স্ত্রীর চাকরি ও নিজের বেতনও এখান থেকে হচ্ছে।”

স্থানীয়রা জানান, সর্বশেষ ২০২০ সালে বিদ্যালয়টি খোলা ছিল। এরপর সেটি বন্ধ হয়ে যায়। এখন সেখানে খড়খুটো ফেলে রাখা হয়।

বিদ্যালয়ের জমিদাতা আবুল কাশেম বলেন, “আমি জমি দান করেছিলাম সমাজসেবার উদ্দেশ্যে। কিন্তু তারা প্রতারণা করেছে। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”

স্কুলটির অনুমোদন প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে। একটি সূত্র জানায়, রাজিবপুর উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আজিম উদ্দিনকে স্কুলের সভাপতি বানিয়ে অনুমোদন আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছিল। গণমাধ্যমে আজিম উদ্দিন স্বীকার করেন, “আমি একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে সভাপতি হই। আমি সুপারিশ করেছিলাম। আনিছ একসময় আওয়ামী লীগ করতেন, পরে জামায়াতে যোগ দেন। সাবেক প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেনের সময় রাজিবপুরে যত রান্নাঘরের প্রকল্প হয়েছিল, সবগুলো কাজ আনিছ পেয়েছিল। টিআর, কাবিখা সবই তার হাত দিয়ে গেছে।”

এছাড়া জামায়াত নেতা আনিছ রাজনীতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে আরও একাধিকবার আলোচনায় আসেন। অভিযোগ রয়েছে, রাজিবপুর থানায় জামায়াতের একটি মামলায় উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল হোসেন ও উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক বায়েজিদ ইসলাম বিজয়কে বাঁচাতে তাদের পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন।

আবুল হোসেন বলেন, “আনিছ আমাকে বলে—সবই তো বোঝো, টাকা ছাড়া কিছু হয় না। দুই লাখ খরচ করো, আমি বলে দিচ্ছি—তাহলে ওরা বাড়িতেই থাকতে পারবে।” তবে আনিছ তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং দাবি করেন, “আমি শুধু পরামর্শ দিয়েছি থানায় গিয়ে ১-২ লাখ টাকা দিয়ে নাম কেটে নিতে।”

বিষয়টি নিয়ে জামায়াত কুড়িগ্রাম জেলা আমির মাওলানা আব্দুল মতিন ফারুকী বলেন, “এটি আমাদের দলের নীতির পরিপন্থী কাজ। কেউ যদি এমন কাজ করে থাকেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিকভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এদিকে স্থানীয় জুলাই যোদ্ধারা ও সাধারণ মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যাদের হাতে আমাদের ভাই শহীদ হয়েছেন, সেই জামায়াত নেতা এখন আওয়ামী লীগের নেতাদের বাঁচানোর নামে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে—এটা মেনে নেওয়া যায় না।”