কূটনৈতিক অস্ত্র পানি নিয়ে ভারতের কঠোর অবস্থান, শঙ্কায় বাংলাদেশ ও পাকিস্তান
- আপডেট সময় : ০৩:২৫:২৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ জুন ২০২৫
- / 52
অনলাইন ডেস্ক:
১৯৯৬ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক গঙ্গা পানি চুক্তির মেয়াদ শেষের পথে। ৩০ বছর মেয়াদি এই চুক্তি ২০২৬ সালের ডিসেম্বরেই শেষ হচ্ছে। এর আগেই ভারতের পক্ষ থেকে চুক্তির শর্ত পুনর্বিবেচনার বার্তা বাংলাদেশের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নয়, বরং সমগ্র উপমহাদেশের পানি নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ টেকসই উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতের সাম্প্রতিক অবস্থান এবং সিন্ধু পানি চুক্তি নিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে এই ইঙ্গিতকে কৌশলগত কূটনীতির অংশ হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।
ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, উত্তর ভারতের কৃষিকাজে পানির চাহিদা বেড়েছে, হুগলি নদীর নাব্যতা বজায় রাখা জরুরি, এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পানি ব্যবস্থাপনায় কৌশলগত পরিবর্তন দরকার। দেশটির কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে উত্তর ভারতীয় রাজ্যগুলোতে সেচের চাহিদা প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এই পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের প্রায় ৮৫ শতাংশ জলপ্রবাহ গঙ্গা তথা পদ্মা নদীর ওপর নির্ভরশীল, যার মূল প্রবাহ আসে ভারতের ফারাক্কা ব্যারেজ থেকে। ভারতের একতরফা সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নদ-নদী শুকিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাড়তে পারে নদীর মোহনায় লবণাক্ততা, হুমকির মুখে পড়তে পারে মিঠা পানির মাছ ও কৃষি উৎপাদন।
২০২১ সালে ইউনেস্কোর এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, ফারাক্কা ব্যারাজের প্রভাবে বাংলাদেশে জলজ জীববৈচিত্র্য, মাছ ধরা এবং কৃষিকাজে মারাত্মক পতন ঘটেছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দুর্বলতা ও অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে ভারত চুক্তির শর্তগুলো তার পক্ষে নিতে চাইছে।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ভারতের জল সংরক্ষণ সক্ষমতা প্রায় ১৪০ মিলিয়ন হেক্টর এলাকায় বিস্তৃত। বিশ্লেষকদের মতে, যদি ভারত গঙ্গার অধিকাংশ পানি নিজেদের কৃষি ও শিল্পে ব্যয় করে, তাহলে বাংলাদেশকেও পাকিস্তানের মতো ভয়াবহ পানিসঙ্কট, কৃষি উৎপাদনে ধস এবং পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে।
এই সংকট মোকাবেলায় এখনই বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রয়োজনে জাতিসংঘ কিংবা বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় আন্তর্জাতিক নদী আইন অনুযায়ী আলোচনায় যেতে হবে।
একইসঙ্গে দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও স্বচ্ছতা বজায় রেখে যৌথ নদী ব্যবস্থাপনা, আধুনিক সেচ পদ্ধতি, পানি সংরক্ষণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান খুঁজে বের করাও জরুরি। কারণ গঙ্গা শুধু একটি নদী নয়, এটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার উৎস।
পানি কখনো কূটনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠলে তা বন্ধুত্বকেও শুকিয়ে ফেলে। তাই দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনা নয়, টেকসই সমাধান এবং আঞ্চলিক সহযোগিতাই হতে পারে ভবিষ্যতের সঠিক পথ।














