তরুণদের ভবিষ্যৎ কী অন্ধকারে!
রাজিবপুরে মাঠের অভাব, অনলাইন জুয়া ও দখলদারদের রাজত্ব
- আপডেট সময় : ১২:৩৭:৫০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ মে ২০২৫
- / 65
লেখা: মো. জাহিদুল ইসলাম
“চরের মানুষ কি মানুষ নয়?”— এই প্রশ্ন শুধু একটি হতাশ যুবকের কণ্ঠে নয়, বরং একটি অঞ্চল, একটি প্রজন্মের আর্তনাদ। কুড়িগ্রাম জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলা রাজিবপুরের মোহনগঞ্জ ইউনিয়নের তরুণ নাফিউল আজম জুয়েলের কথাগুলো যেন তুলে ধরে এখানকার বাস্তবতা: অবহেলা, বঞ্চনা, আর হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনার গল্প।
এই এলাকাটি শুধু ভৌগলিকভাবে নয়, উন্নয়ন এবং সুযোগ-সুবিধার দিক থেকেও বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন এক এলাকা। পদ্মা-ব্রহ্মপুত্র-যমুনার বন্যা প্রবণ চরে গড়ে ওঠা যেন ‘সম্ভাবনার শেকলবদ্ধ ক্যানভাস’।
রাজিবপুর উপজেলার বড় একটি ইউনিয়ন মোহনগঞ্জ—যার আয়তন প্রায় ৯টি ওয়ার্ড এবং ১৭টি মৌজায় বিস্তৃত। প্রায় ৩০ হাজার মানুষের বসবাস এখানে, যার ৭০ শতাংশের বেশি মানুষ বসবাস করেন দুর্গম চরাঞ্চলে। যোগাযোগ ব্যবস্থা বলতে বর্ষাকালে নৌকা আর শুকনো মৌসুমে বালুচর পেরিয়ে মাইলের পর মাইল হাঁটার নামান্তর। নেই কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র, আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কিংবা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—তরুণ প্রজন্মের মানসিক ও শারীরিক বিকাশের প্রধান অনুষঙ্গ: খেলার মাঠ।
এই সংকটের গভীরতা বুঝতে হলে চরের শিশুদের দিকে তাকালেই যথেষ্ট। ৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থী আশরাফুল ইসলাম জানায়, “স্কুলে খেলার জায়গা নেই, টিফিনের সময় সবাই মোবাইল বের করে গেম খেলে। বিকেলেও খেলতে পারি না। বাধ্য হয়ে মোবাইলেই সময় কাটাই।”
মোহনগঞ্জ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আখতারুজ্জামান জানান, “বর্তমানে যেভাবে স্কুলের নতুন ভবন নির্মাণ হচ্ছে, তাতে মাঠ রাখার জায়গা থাকছে না। আগে যেটুকু মাঠ ছিল, তাও এখন ভবনের নিচে চাপা পড়ে গেছে। শিশুরা খেলাধুলা থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়ছে, ফলে তারা মোবাইল আসক্তিতে জড়িয়ে পড়ছে।”
শিশুদের এই বিকাশহীন জীবন একদিকে যেমন তাদের মানসিকভাবে দুর্বল করে দিচ্ছে, অন্যদিকে এক ধরনের একাকীত্বের জন্ম দিচ্ছে, যা ভবিষ্যতে ভয়াবহ সামাজিক সমস্যার রূপ নিতে পারে।
তরুণদের অবসর এখন কেটে যায় PUBG, Free Fire কিংবা Facebook Reels দেখে। এখান থেকেই শুরু হয় আরেক বিপজ্জনক যাত্রা—অনলাইন জুয়া। মোহনগঞ্জ ইউনিয়নের বাসিন্দা নাফিউল আজম জুয়েল বলেন, “যেহেতু এখানে কোনো মাঠ নেই, তাই তরুণরা খেলাধুলার চর্চা করতে পারছে না। ফলে মোবাইল ও অনলাইন গেমে আসক্ত হয়ে পড়ছে। অনেকে জড়িয়ে পড়ছে বাজির খেলায় বা জুয়ার আসরে।”
এই আসক্তি শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। পারিবারিক অশান্তি, আর্থিক বিপর্যয়, সম্পর্ক ভাঙন—সবই এর ফলশ্রুতি। তাছাড়া, এই অনলাইন জুয়া আইনত নিষিদ্ধ হলেও প্রমাণ সংগ্রহ কঠিন হওয়ায় প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপও সীমিত।
তরুণদের জন্য মাঠ বরাদ্দ দেওয়ার দাবি জানিয়ে জুয়েল বলেন, “যদি একটি খেলার মাঠ থাকত, তাহলে তরুণদের মাঝে একটি ইতিবাচক সংস্কৃতি গড়ে উঠত। খেলাধুলার চর্চা থাকলে মোবাইল ও অনলাইন জুয়ার প্রতি এই আসক্তি কমে যেত।” তিনি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের কাছে মোহনগঞ্জে একটি মাঠ বরাদ্দের দাবি জানিয়েছেন।
রাজিবপুর উপজেলায় বর্তমানে মাত্র একটি সরকারি খেলার মাঠ রয়েছে—‘শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম’। এটি একসময় তরুণদের প্রাণকেন্দ্র ছিল। ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টনের চর্চা হতো এখানে। কিন্তু এখন মাঠটির নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে মৌসুমী ব্যবসায়ীদের হাতে। সরেজমিনে মাঝে মাঝে দেখা যায়, মাঠজুড়ে শুকানো হচ্ছে সরিষা, গম, ভুট্টা, পাট।
স্থানীয়রা জানান, বছরের প্রায় প্রতিদিনই মাঠটি ব্যবসার কাজে ব্যবহৃত হয়। এক যুবক বলেন, “আমরা ছোটবেলায় এই মাঠে খেলতাম। এখন পুরো মাঠ দখল হয়ে থাকে, তাই খেলার পরিবেশই থাকে না।”
রাজিবপুরের বিশিষ্ট ক্রীড়াবিদ রেজাউল করিম লিটন বলেন, “মাদক, অনলাইন গেম বা জুয়া থেকে তরুণ সমাজকে ফিরিয়ে আনতে খেলাধুলার কোনো বিকল্প নেই। খেলাধুলা মানে শুধু শরীরচর্চা নয়, এটা মানসিক প্রশান্তি ও শৃঙ্খলারও উৎস। রাজিবপুরের মতো একটি উপজেলায় মাত্র একটি মাঠ, তাও যদি দখলে থাকে, তাহলে আগামী প্রজন্ম কীভাবে গড়ে উঠবে?”
সমাধানের পথ: কী করতে হবে এখনই? প্রথমত, খাসজমি চিহ্নিত করে মাঠ নির্মাণ: প্রতিটি ইউনিয়নে অন্তত একটি করে খেলার মাঠ তৈরির জন্য জরুরি উদ্যোগ নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম দখলমুক্ত করা: প্রশাসনকে কঠোরভাবে মাঠ দখলদারদের উচ্ছেদ করতে হবে। তৃতীয়ত, স্কুল পর্যায়ে খেলার সুযোগ নিশ্চিত করা: ভবন নির্মাণে মাঠ সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা উচিত। চতুর্থত, তরুণদের কাউন্সেলিং ও সচেতনতা: অনলাইন জুয়ার ক্ষতি সম্পর্কে স্কুল ও কলেজে ক্যাম্পেইন চালানো দরকার। সবশেষ, স্থানীয় ক্রীড়া সংস্থার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
রাজিবপুরের বর্তমান পরিস্থিতি একটি গোটা প্রজন্মের সম্ভাবনা নষ্ট করে দিচ্ছে নিঃশব্দে। মাঠ নেই, অবসর নেই, দিশা নেই—এমন বাস্তবতায় যুবসমাজ অনলাইন জুয়া, মাদক ও অপরাধে ঝুঁকছে। প্রশাসনের দৃষ্টিসীমা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা না থাকলে এই সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। এখনই সময় পদক্ষেপ নেওয়ার।
রাজিবপুরের চরে জন্ম নেওয়া প্রতিটি শিশু ও তরুণের রয়েছে সম্ভাবনা। কিন্তু অবহেলা, সামাজিক উদাসীনতা ও ব্যর্থতার ফলে তারা ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে নেশা, অপরাধ ও হতাশার অন্ধকারে। সময় এসেছে গা ঝাড়া দিয়ে ওঠার। এখনই যদি মাঠ ফেরানো না যায়, তাহলে হারিয়ে যাবে একটি প্রজন্ম—নিঃশব্দে, অপ্রত্যাশিতভাবে। নয়তো আমরা হারিয়ে ফেলবো আমাদের ভবিষ্যৎ।
















