নদীভাঙনে গৃহহীন, অবহেলায় স্বাস্থ্যহীন-কোথায় যাবে মোহনগঞ্জ?
- আপডেট সময় : ১০:৫৫:৪২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৫
- / 129
মোঃ আক্তারুজ্জামান সরকার:
কুড়িগ্রামের দক্ষিণপ্রান্তে, ব্রহ্মপুত্র নদের ধারের একটি জনপদ, মোহনগঞ্জ। রাজীবপুর উপজেলার একদা সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন এটি। জনসংখ্যা, কৃষি, শিক্ষা, সামাজিক উদ্যোগ, সব দিক থেকেই এটি ছিল উপজেলার প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু প্রকৃতি যে কখনো কখনো নির্মম হয়, সেটির সাক্ষ্য বহন করছে আজকের মোহনগঞ্জ। ব্রহ্মপুত্র নদের করালগ্রাসে ইউনিয়নের প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা আজ বিলীন। হারিয়েছে হাজারো মানুষের স্বপ্ন, জীবনের নিশ্চয়তা, হারিয়েছে হাসিমুখের সকাল।
এক সময়ের সুজলা-সুফলা ইউনিয়নটি এখন অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। চরাঞ্চলের হৃদয়ে, বালুময় পথ পেরিয়ে, দুর্ভোগের ভেতর টিকে আছে কিছু মানুষ। তাঁদের কেউ নদীভাঙনের যন্ত্রণা বুকে চেপে মাঠে কাজ করেন, কেউবা সন্তানদের নিয়ে লড়েন শিক্ষার জন্য। কিন্তু সব চেষ্টা, সব স্বপ্ন মুখ থুবড়ে পড়ে যখন পরিবারে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ে। কারণ মোহনগঞ্জে নেই কোনো হাসপাতাল, এমনকি নেই একটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রও।
যে দেশে গ্রামের প্রান্তিকতম মানুষের কাছেও মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় সরকার, সেই দেশের একটি ইউনিয়ন, যেখানে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ বাস করেন, সেখানে একটি চিকিৎসাকেন্দ্র নেই, এটি কেবল অবহেলা নয়, এটি এক ধরনের নৈতিক ব্যর্থতা।
আশার আলো, কিন্তু না পৌঁছায় গৃহদ্বারে
নদীর তীর রক্ষার জন্য ৫১২ কোটি টাকার প্রকল্প চালু হয়েছে, কাজও চলছে। মানুষ নতুন করে ঘর বাঁধছে, ছোট ছোট দোকান উঠেছে আবার। শিশুদের হাসি ফিরছে খেলাধুলায়। কিন্তু এই হাসিগুলো সহজেই থেমে যেতে পারে একটি অজানা জ্বরে, হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়া কোন বৃদ্ধার শরীরে, অথবা প্রসবব্যথায় কাতর কোনো মায়ের আর্তনাদে।
এই মুহূর্তে মোহনগঞ্জের বাসিন্দাদের প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য ছুটে যেতে হয় রাজীবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, যা কাগজে কলমে মাত্র ৮ কিলোমিটার দূরে হলেও বাস্তবে ভাঙা রাস্তা আর যানবাহনের সংকটে তা ১৫ কিলোমিটারের যন্ত্রণাময় যাত্রা হয়ে দাঁড়ায়। এতো কষ্টের পথ পাড়ি দিয়ে, একজন মুমূর্ষু রোগী যখন হাসপাতালে পৌঁছান, ততক্ষণে অনেক সময়ই অনেক দেরি হয়ে যায়।
প্রশাসনের অবস্থান
রাজীবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সারওয়ার জাহান জানিয়েছেন “আমি ওই এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। কিন্তু তারা কেউ জমি দিতে রাজি হননি। তারা জমি দিলে সরকার ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন করবে।”
এই বক্তব্য থেকে একটি বিষয়ের ইঙ্গিত পাওয়া যায়, সরকারি উদ্যোগের চাকা ঘোরাতে জমির প্রয়োজন, কিন্তু জমি না পাওয়ার অজুহাতে উদ্যোগ স্থবির হয়ে আছে। তবে প্রশ্ন ওঠে, এই দেশেতো প্রতিটি ইউনিয়নে স্কুল, কলেজ, অফিস, রাস্তা সবই হয়েছে সরকারের নিজস্ব উদ্যোগে, প্রয়োজনে জমি অধিগ্রহণ করে। তাহলে শুধু মোহনগঞ্জে স্বাস্থ্যসেবার বেলায় এই ব্যতিক্রম কেন?
যেখানে প্রতিনিয়ত নদীভাঙনে গৃহহীন হচ্ছে মানুষ, সেখানে জমি ‘না পাওয়া’র যুক্তি কি বাস্তবতার সঙ্গে যায়? মানুষ যখন নিজের শেষ আশ্রয়টুকু হারিয়ে সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকে, তখন সরকারের দায়িত্ব কি শুধু জমির অপেক্ষা করা?
একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র মানে শুধু একটি ভবন নয়
মোহনগঞ্জের মানুষের জন্য একটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র কেবল একটি সরকারি স্থাপনা নয়, এটি জীবনের নিরাপত্তা, এটি মধ্যরাতে অসুস্থ সন্তানের পাশে দাঁড়ানোর একটি হাত, এটি প্রান্তিক নারীর গর্ভকালীন সেবা পাওয়ার অধিকার, এটি প্রতিদিন মাঠে কাজ করতে নামা কৃষকের জীবনের নিশ্চয়তা।
একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র মানে কিছু ওষুধের সংস্পর্শ, একজন ডাক্তার, একজন নার্স অথচ এই সাধারণ দাবিটুকুও পূরণ হয়নি স্বাধীনতার ৫৩ বছর পেরিয়েও।
যে ইউনিয়ন একসময় ছিল উপজেলা পর্যায়ের সবচেয়ে জনবহুল ও গুরুত্বপূর্ণ, সেই মোহনগঞ্জ আজ অবহেলার প্রতিচ্ছবি। রাষ্ট্র ও প্রশাসনের প্রতি প্রশ্ন-কেন এই নির্মমতা? কেন মোহনগঞ্জের কান্না কেউ শুনছে না?
শেষ কথার আগে
যে জাতি স্বাস্থ্যকে উন্নয়নের প্রধান শর্ত হিসেবে দেখে, সে জাতির প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে উন্নয়নের ব্যাখ্যা অসম্পূর্ণ। মোহনগঞ্জ যেন সেই ভুল ব্যাখ্যার এক জীবন্ত দলিল।
আমরা চাই, মোহনগঞ্জে হোক একটি পূর্ণাঙ্গ ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র। ছোট্ট একটি ভবন, কিছু ওষুধ, একজন নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসক আর সরকারি সদিচ্ছা-এতটুকুই তো চাওয়া। এই চাওয়াটা কি খুব বেশি?
মোহনগঞ্জের চোখে এখনো আলো আছে, তবে সে আলো যেন না নিভে যায় স্বাস্থ্যহীনতার অন্ধকারে।
লেখক: শিক্ষক, নয়া চর নিম্ন মাধ্যমিক বালক, বিদ্যালয়।

















এতো সুন্দর ভাষায় যে নিউজ করছেন তাকে অসখ্য ধন্যবাদ সেই সাথে বাস্তব দিক তুলে ধরার জন্য আবারও ধন্যবাদ
সুন্দর লেখছেন,
এ যেনো মাটির টানে মাটির কথা ❤️ধন্যবাদ❤️