প্রবাসী পরিবারের উপর হামলা, এসএসসি পরীক্ষার্থী সাহেল মিথ্যা মামলায় কারাবন্দি
- আপডেট সময় : ১০:১৬:৪৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২০ জুন ২০২৫
- / 53
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কণকপুর ইউনিয়নের নাগড়া গ্রামে প্রবাসী একটি পরিবারের উপর ধারাবাহিক হামলা, হুমকি ও মিথ্যা মামলার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী পরিবারটি জানায়, জমি-জমা নিয়ে দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিরোধের জেরে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে চাচা মাহফুজুর রহমান মোবারক ও তার স্ত্রী রত্না বেগম ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করেছেন।

ভুক্তভোগী হালিমা ইসলাম (৪৩) জানান, তার স্বামী সামছুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে কর্মরত। তাদের একমাত্র ছেলে সাহেল ইসলাম সোহান (১৭) ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৯ অক্টোবর স্থানীয় কিশোর গ্যাং লিডার তামিম ও শাহীনসহ কয়েকজনকে দিয়ে সাহেলের উপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়। এতে সে গুরুতর আহত হয়ে একটি দাঁত হারায়। এই ঘটনায় মৌলভীবাজার মডেল থানায় মামলা (নং ২০/৩১০, তারিখ: ১৩/১০/২০২৪) হলেও অভিযুক্ত কেউ এখনো গ্রেপ্তার হয়নি।
হালিমা ইসলাম অভিযোগ করেন, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই পার্থ রঞ্জন চক্রবর্তীর নিষ্ক্রিয়তার কারণে দীর্ঘ ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও কোনো আসামিকে আইনের আওতায় আনা হয়নি। এমনকি আসামিরা মুক্তভাবে এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং সামাজিক মাধ্যমে ভুক্তভোগী পরিবারকে নিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে।
এরই মাঝে, চলমান এসএসসি পরীক্ষার সময় ১২ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে সাহেলের অনুপস্থিতিতে মোবারক ও তার সহযোগীরা—মাসুক, কাইয়ুম, কামাল, ইকবাল ও সোয়েব—ওই পরিবারের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ঘরবাড়ি ভাঙচুর করে। হালিমা ইসলাম ও তার কন্যা ছাবিলা ইসলাম (১৪) শারীরিকভাবে লাঞ্ছনার শিকার হন। সাহেল বাড়ি ফিরে এলে তাকেও কাঠের টেবিল দিয়ে মারধর করা হয়।
অভিযুক্ত মোবারকের চোখে সামান্য আঘাত লাগার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তার স্ত্রী রত্না বেগম ১৪ এপ্রিল একটি পাল্টা মামলা দায়ের করেন। এতে সাহেল, তার মা হালিমা ও প্রবাসী বাবা সামছুল ইসলামকে অভিযুক্ত করা হয়। শিশু আদালত ১৬ ও ১৭ এপ্রিল মা ও ছেলেকে জামিন দিলেও, পরে “হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের” অভিযোগে আবারো সাহেলের জামিন বাতিল চেয়ে আবেদন করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মনোজ কুমার সরকারের বিতর্কিত প্রতিবেদন অনুযায়ী আদালত ২৬ মে ২০২৫ তারিখে সাহেলের জামিন বাতিল করে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন। বর্তমানে সাহেল কারাগারে।
এই পরিস্থিতিতে হালিমা ইসলাম তার কন্যা ছাবিলাকে নিয়ে আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমার একমাত্র নাবালক ছেলে মিথ্যা মামলায় জেলে, আর আমি মেয়েকে নিয়ে আতঙ্কে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। আমাদের স্বাভাবিক জীবন ধ্বংস হয়ে গেছে।”
মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাহেল সম্পর্কে শিক্ষক ও সহপাঠীরা জানান, সে অত্যন্ত মেধাবী ও নম্র স্বভাবের। তারা দাবি করেন, সাহেলকে পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে, যা একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতের জন্য ভয়ানক হুমকি। তারা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান এবং আদালতের কাছে সুবিচার কামনা করেন।
স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত বিচার দাবি করেছেন। তাদের মতে, মামলাগুলো উদ্দেশ্যমূলক এবং একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ ধ্বংসের ষড়যন্ত্র ছাড়া কিছু নয়। বাদীপক্ষের বক্তব্য নেওয়ার একাধিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও মাহফুজুর রহমান মোবারক ও তার স্ত্রী রত্না বেগম কোনো মন্তব্য দিতে রাজি হননি।
তবে এসব বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মনোজ কুমার সরকার ও এসআই পার্থ রঞ্জন চক্রবর্তী সাথে যোগাযোগ করা যায়নি।
মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি প্রশাসনিক দুর্বলতা, পক্ষপাতদুষ্ট তদন্ত এবং প্রভাবশালী মহলের দাপটের ফল। তারা সরকারের উচ্চমহল, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
সাহেল ইসলামের ভবিষ্যৎ আজ অনিশ্চিত। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও একটি মেধাবী শিক্ষার্থীর জীবন ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার লক্ষ্যে রাষ্ট্র ও সমাজের সংহত পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি। ভুক্তভোগী পরিবারটি প্রশাসন ও মানবাধিকার সংস্থার দৃষ্টি আকর্ষণ করে সুষ্ঠু তদন্ত ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।













