কুড়িগ্রামের প্রত্যন্ত জনপদে বিশ্ববিদ্যালয়! বাস্তবতা না স্বপ্ন?
- আপডেট সময় : ০২:৫৭:২৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ মে ২০২৫
- / 87
নিজস্ব প্রতিবেদক:
ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকায় গড়ে ওঠা কুড়িগ্রাম জেলার দক্ষিণাঞ্চলের দুটি সীমান্তবর্তী উপজেলা-রৌমারী ও রাজিবপুর। এখানকার মানুষের জীবন-জীবিকা প্রতিনিয়তই জড়িয়ে থাকে নদীভাঙন, দারিদ্র্য ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার মতো দুর্ভোগের সঙ্গে। এ অঞ্চলের তরুণ-তরুণীরা স্বপ্ন দেখে উচ্চশিক্ষার, তবে অর্থনৈতিক সংকট ও সুযোগের অভাবে সেই স্বপ্ন অনেক সময়ই অধরা থেকে যায়।
ঠিক এমন এক বাস্তবতায় আশার আলো হয়ে হাজির হয়েছেন Next CEO Ltd. ও Next CEO USA-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, তরুণ উদ্যোক্তা মো. লিমন মিয়া। তিনি নিজেই রৌমারী-রাজিবপুর জনপদের সন্তান। সম্প্রতি তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, এই জনপদেই একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছেন তিনি।
তার ভাষায়, “আমি এই জনপদের সন্তান। তাই এখানকার মানুষের জন্য কিছু করতে চাই। তবে এটি একক কোনো সিদ্ধান্ত নয়। আমি চাই রৌমারী ও রাজিবপুরের প্রতিটি মানুষ তাদের মতামত ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই উদ্যোগকে নিজেদের উদ্যোগ হিসেবে গ্রহণ করুক। কারণ এই বিশ্ববিদ্যালয় হবে আমাদের সবার।”
তার এই ঘোষণার পরপরই রৌমারী-রাজিবপুর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে আশাবাদের বার্তা। শিক্ষার্থীদের মাঝে তৈরি হয় একধরনের উদ্দীপনা, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। অনেক অভিভাবক মনে করছেন, এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় হলে সন্তানদের আর শহরে পাঠিয়ে নিরাপত্তা ও ব্যয় নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকতে হবে না। বিশেষ করে মেয়েশিক্ষায় এটি হবে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। কেউ কেউ বলছেন, “এটি শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং আমাদের আত্মমর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠবে।”
বর্তমানে রাজিবপুর ও রৌমারী উপজেলায় উচ্চশিক্ষা বলতে একটি করে সরকারি কলেজ ছাড়া তেমন কোনো অবকাঠামো নেই। মানসম্মত কোচিং সেন্টার বা গবেষণার সুযোগ নেই বললেই চলে। ফলে বহু মেধাবী শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখেও বাস্তবায়ন করতে পারে না। কেউ কেউ শহরমুখী হলেও, অর্থনৈতিক বা সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে মাঝপথেই তাদের শিক্ষাযাত্রা থেমে যায়।
এই বাস্তবতায়, লিমন মিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা যেন মরুভূমিতে এক ফোঁটা পানির মতো। এটি যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে এই জনপদের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।
এখানে একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠলে তা শুধু শিক্ষার পরিধি বাড়াবে না, বরং এর প্রভাবে সৃষ্টি হবে বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন। গড়ে উঠবে হোস্টেল, ক্যান্টিন, বুকশপ, টিউশন সেন্টারসহ নানা সহায়ক প্রতিষ্ঠান। বাড়বে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান। শিক্ষক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা নিয়োগের মাধ্যমে অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের আগমন ঘটবে এই জনপদে।
বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে এখান থেকেই তৈরি হতে পারে বিশ্বমানের উদ্যোক্তা, গবেষক ও পেশাজীবী। পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা নিজের এলাকাতেই আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা লাভের সুযোগ পাবে, যা দেশের প্রান্তিক অঞ্চলে শিক্ষার মানোন্নয়নের পথ খুলে দেবে।
তবে একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পথ মোটেই সহজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন সরকারের অনুমোদন, নির্দিষ্ট শিক্ষাগত মানদণ্ড বজায় রাখা, দক্ষ জনবল, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং একটি টেকসই অবকাঠামো। এর পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ না থাকলে, এই উদ্যোগ শুধুই একটি রোমান্টিক স্বপ্ন হয়েই থেকে যেতে পারে।
এই বিষয়টি মাথায় রেখেই লিমন মিয়া শুরু থেকেই স্থানীয় জনগণের মতামত ও অংশগ্রহণকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন, যা এই প্রকল্পকে অন্যান্য প্রচেষ্টা থেকে আলাদা ও কার্যকর করে তুলতে পারে।
এই বিশ্ববিদ্যালয় যদি সফলভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে এটি হবে শুধুই একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং একটি সামাজিক আন্দোলনের নাম, যা এই জনপদের হাজারো তরুণের ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভিত্তি হয়ে দাঁড়াবে। এখান থেকেই উঠে আসবে আগামী দিনের গবেষক, চিন্তক, উদ্যোক্তা, লেখক ও সমাজনেতারা।
একদিন হয়তো ইতিহাস সাক্ষ্য দেবে,প্রান্তিক জনপদের এক তরুণ স্বপ্ন দেখেছিলেন উচ্চশিক্ষার আলো জ্বালানোর, আর সেই স্বপ্নই হয়ে উঠেছিল একটি অঞ্চল পরিবর্তনের অনন্য উদাহরণ।













